বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

মৃত মুখের ঘটনাটুকু


মূলঃ ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা [১৯২৫]
অনুবাদঃ কল্যাণী রমা 

“হ্যাঁ, এসে দেখে যাও, এই অবস্থা হয়েছে ওর। ওহ্‌, কী ভীষণই যে ও তোমাকে আর একবার দেখতে চেয়েছিল।” লোকটির শাশুড়ি তাকে তাড়াহুড়ো ক’রে ঘরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল। তার স্ত্রীর বিছানার পাশের সব মানুষ একইসাথে তার দিকে তাকাল।
“একবারটি ওকে দেখ।” তার শাশুড়ি স্ত্রীর মুখ ঢেকে রাখা কাপড়টা সরাতে সরাতে আবার বলে উঠল।
হঠাত্‌ লোকটি বলে উঠল। “আমি কি ওকে একটু একা দেখতে পারি? তোমরা সবাই এই ঘরে ওর সাথে আমাকে একটু একা থাকতে দেবে?”
লোকটির কথায় স্ত্রীর পরিবারে সহানুভূতি জেগে উঠল। ওরা ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। স্লাইডিং দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে।
সে সাদা কাপড় সরিয়ে দিল।
তার স্ত্রীর মুখ মৃত্যুতে, বেদনায় শক্ত হ’য়ে গেছে। গালগুলো ভিতরে ঢুকে গেছে, বিবর্ণ দাঁতগুলো ঠোঁটদু’টোর মাঝ থেকে ঝুলে আছে। চোখের পাতার মাংস শুকিয়ে চোখের মণিকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। কপালে এক স্পষ্টত প্রতীয়মান টান টান উত্তেজনা সেই ব্যথাকে জমাট ক’রে রেখেছে।
সে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হ’য়ে বসে থাকল। মৃতের বিশ্রী মুখটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে।
তারপর, কাঁপা কাঁপা হাতদু’টো সে স্ত্রীর ঠোঁটের উপর রাখল। মুখটা বন্ধ করবার চেষ্টা করল। কিন্তু জোর ক’রে ঠোঁটদু’টো বন্ধ রাখতে চেষ্টা করতে গিয়ে দেখে হাত সরিয়ে নিলেই ঠোঁটদু’টো আবার নিস্তেজ হ’য়ে খুলে যাচ্ছে। আবার মুখটা বন্ধ করল সে। আবার খুলে গেল মুখ। বারবার এমন ক’রেও সফল হওয়া গেল না। কিন্তু দেখা গেল স্ত্রীর মুখের চারপাশ ঘিরে যে কঠিন রেখাগুলো ছিল তা যেন নরম হ’তে শুরু করেছে।
তখন সে আঙ্গুলের ডগায় যেন এক ক্রমশ বেড়ে ওঠা কামনা অনুভব করতে থাকল। সে স্ত্রীর কপালে আঙ্গুল ঘষে ঘষে সব উদ্বেগ, সব দুশ্চিন্তা দূর ক’রে দেওয়ার চেষ্টা করল। তার হাতের তালু গরম হ’য়ে উঠল।
আর একবার চুপ ক’রে বসে থেকে সে এই নতুন মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকল।
স্ত্রীর মা এবং ছোটবোন ভিতরে আসল। “তুমি নিশ্চয়ই ট্রেনজার্নি ক’রে ক্লান্ত। দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নাও...ওহ্‌!”
মার দু’চোখ বেয়ে হঠাত্‌ জল গড়িয়ে পড়ল। “মানুষের আত্মা এক ভয়ংকর জিনিষ। তুমি ফিরে না এলে ও পুরোপুরি মারা যেতে পারছিল না। কী আশ্চর্য। তুমি ওর দিকে শুধু একবার তাকিয়েছ আর ওর মুখ কী অদ্ভুত শিথিল, নরম হ’য়ে গেছে...ঠিক আছে। এখন সব ঠিক আছে।”
স্ত্রীর ছোটবোনের চোখগুলোতে এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য ভাসছে। সে তার দিকে তাকাল। রাগ ঝরে পড়ছে সে চোখে।  তারপর মেয়েটিও কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।