রবিবার, ১০ জুলাই, ২০১১

ভোরবেলায় পায়ের নখ

মূলঃ ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা  [১৯২৬]   
অনুবাদঃ কল্যাণী রমা

[ প্রকাশিতঃ http://www.banglamati.net/august-11/bishwa.php ]

জীর্ণ বাড়িটার দোতালায়, একটা ভাড়া করা ঘরে একটি গরীব মেয়ে থাকত। বাগদত্তকে বিয়ে করবার জন্য অপেক্ষা করছিলো মেয়েটি। কিন্তু প্রত্যেক রাতে আলাদা, আলাদা লোক আসত ওর ঘরেভোরের সূর্য বাড়িটায় আলো দিত না কোন। মেয়েটি প্রায়ই বাড়ির পিছনের দরজাটার বাইরে কাপড়চোপড় ধুত। ক্ষয়ে যাওয়া খরম পড়ে - ছেলেদের ব্যবহৃত।
প্রত্যেক রাতে পুরুষগুলো একই কথা বলত। “এ আবার কি? তোমার মশারি নেই নাকি?”
“খুব দুঃখিত। সারা রাত জেগে মশা তাড়াব আমি। দয়া করে ক্ষমাঘেন্না করে দিন আমায়।”
ঘাবড়ে গিয়ে একটা সবুজ রঙের কয়েল জ্বালিয়ে দিত মেয়েটি। তারপর আলো নিভিয়ে দিত। কয়েলের ওই ছোট আলোর ফুলকির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে  ছেলেবেলার কথা মনে পড়ত ওর। সব সময় পুরুষগুলোর শরীরে পাখা দিয়ে বাতাস করত মেয়েটি। আর নিজে পাখা দুলিয়ে চলবার স্বপ্ন দেখে যেত।
এদিকে ততক্ষণে প্রায় শরতকাল এসে গেছে।
এক বয়স্ক লোক দোতলার ঘরটাতে এল। অস্বাভাবিক ঘটনা।
“মশারি টাঙ্গাবে না?”
“খুব দুঃখিত। সারা রাত জেগে মশা তাড়াব আমি। দয়া করে ক্ষমাঘেন্না করে দিন আমায়।”
“ওহ্, একটু থাম।” বুড়ো মানুষটি দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল।
মেয়েটি বুড়ো লোকটিকে আকড়ে ধরল। “ভোর পর্যন্ত মশা তাড়াব  আমি। একটুও ঘুমাব না ।”
“এখনই ফিরব আমি।”
সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল বুড়ো লোকটি। আলো জ্বালিয়ে রেখেই মেয়েটি মশার কয়েলটা জ্বালাল। একা একা ঘরের ওই উজ্জ্বল আলোর ভিতর মেয়েটির তখন কিছুতেই আর ছেলেবেলার কথা মনে পড়ল না।
প্রায় ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই বুড়ো মানুষটি ফিরল। লাফ দিয়ে উঠল মেয়েটি।

“বাহ্‌! তোমার তো অন্ততঃ মশারি টাঙ্গানোর হুক পোঁতা আছে দেখছি দেওয়ালে।”
ওই জীর্ণ ঘরে বুড়ো লোকটি নতুন শাদা মশারিটি টাঙ্গিয়ে দিল। মেয়েটি ভিতরে ঢুকল। মশারিটির ঘের ছড়িয়ে মেলে দিতে গিয়ে, নতুন মশারিটির গন্ধ ছুঁয়ে মেয়েটির হৃৎপিন্ডটা যেন আরো জোরে ধুকপুক করে উঠল।

“জানতাম তুমি ফিরবে। তাই আলো না নিভিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। আলোর ভিতর এই নতুন শাদা মশারিটাকে আরো কিছুক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে বড় বেশি ইচ্ছে করছে।”
কিন্তু যে ঘুমের জন্য এতগুলো মাস ধরে অপেক্ষা করছিলো মেয়েটি, সেই গভীর ঘুমেই ঘুমিয়ে পড়ল ও।  জানতেও পারল না কখন যে বুড়ো মানুষটি ভোরবেলা উঠে চলে গেল।
“এই...এই...”
বাগদত্তর চিৎকার চেঁচামেচিতে মেয়েটির ঘুম ভেঙ্গে গেল।

“এতদিন পর অবশেষে কাল আমরা বিয়ে করতে পারব!...বাহ্‌, বেশ সুন্দর মশারি তো। তাকালেই মনটা খুশী হ’য়ে যায় তো।” ছেলেটি কথা বলতে বলতে মশারিটি হুক থেকে খুলে ফেলল। তার নীচ থেকে মেয়েটিকে টেনে বের করল। ছড়িয়ে থাকা  মশারিটির উপর বসিয়ে দি’ল মেয়েটিকে। “ঠিক এইখানে মশারিটির উপর বস। একটা বিরাট পদ্মফুলের মত দেখতে লাগছে তো। ঘরটাকেও এত পবিত্র দেখাচ্ছে...ঠিক তোমারই মত।”

ওই নতুন কাপড়ের স্পর্শে মেয়েটির নিজেকে নতুন বউ-এর মত মনে হ’ল।
“পায়ের নখগুলো কাটতে হবে।” যে শাদা মশারিটা পুরো ঘরটাকে প্রায় ভরে দিয়েছিলো, তার উপর বসে মেয়েটি বহুদিনের অযত্নে ফেলে রাখা নখগুলো কাটতে শুরু করল। নিষ্পাপভাবে।

(জে. মারটিন হলম্যান-এর ইংরেজী অনুবাদ থেকে)


৪টি মন্তব্য:

  1. রমা,
    অনেক দিন পর আপনার লেখা পড়লাম। অসাধারণ লাগল।
    ভালো থাকবেন।
    শুভ কামনা।

    www.sujansupantha.wordpress.com

    উত্তরমুছুন
  2. Dhonyobad!
    Ashole Lane Dunlop ar J. Martin Holman-er onubad-e Kawabata-r ei‘Palm-of-the-Hand Stories’ boi ti amar boro priyo…ashchorjyo shob hirer kuchi-r moto golpo!
    Jokhon i pori, tokhon i kichhukhon chup kore boshe thaki…

    উত্তরমুছুন
  3. কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার মতই গল্প, কল্যাণী রমা। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ মহতরমা, হাতের নাগালে এনে দিলেন বলে।

    ভাল থাকুন।

    উত্তরমুছুন