রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১১

ঘুমের অভ্যাস

মূলঃ ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা [১৯২৪]
অনুবাদঃ কল্যাণী রমা

(অটোয়া থেকে বের হওয়া ‘আশ্রম’পত্রিকার ‘নভেম্বর, ২০১১’ সংখ্যায় প্রকাশিত।)

তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় চমকে উঠল মেয়েটি। কেউ যেন ওর চুল ধরে টানছে। ঘুম ভেঙ্গে গেল তিন, চারবার। কিন্তু যখন ও বুঝতে পারল সুতার মত ওর একটা কালো চুলই আসলে প্রেমিকের গলায় পেঁচিয়ে আছে, নিজের মনেই হেসে উঠল মেয়েটি ভোরবেলা ঘুম ভেঙ্গে ও এবার বলতে পারবে, “আমার চুল বেশ লম্বা হয়েছে আজ। যখন আমরা দু’জন একসাথে ঘুমাই, সত্যি সত্যি আমার চুল আর একটু যেন লম্বা হ’য়ে ওঠে।”

চুপচাপ চোখ বন্ধ করল মেয়েটি।

“আমি ঘুমাতে চাই না। আমাদের কেন ঘুমাতে হ’বে? যদিও আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা, তবু সবকিছু বাদ দিয়ে শেষ পর্যন্ত কি না ঘুমাতে হ’বে আমাদের!” যে-সব রাতে ছেলেটির কাছে থাকাটা মেয়েটির পক্ষে সম্ভব হ’ত, ও এই কথাটাই বলত বারবার, যেন এ ওর কাছে এক ভীষণ রহস্য ছিল।

“দেখ বিশ্বাস কর, মানুষ নিখুঁতভাবে প্রেম করে শেষে ঘুমাতে পারবে বলেই। যে প্রেম কখনো ঘুমায় না, সে তো ভয়ংকর। পিশাচের চিন্তা সেই সব। অপদেবতা ভর করেছে যেন।”

“সে কথা সত্যি নয়। প্রথমদিকে আমরাও তো ঘুমাতাম না, মনে নেই? ঘুমের মত স্বার্থপর আর কিছুই হয় না।”

এ কথাটা সত্য ছিল। যখনই ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়ত, মেয়েটির গলার নিচ থেকে ও ঘুমের ভিতর নিজের হাত বের করে নিত, নিজের অজান্তেই - ভুরু কোঁচকাতে, কোঁচকাতে। আর মেয়েটিও যখন ঘুম ভেঙ্গে উঠত, দেখত ওর হাত থেকে সব শক্তি যেন চলে গেছে। তা যেভাবেই ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাত না কেন মেয়েটি।

“ঠিক আছে, আমি তা’হলে তোমার হাত শক্ত করে আমার চুল দিয়েই পেঁচিয়ে, পেঁচিয়ে রাখব।”

তারপর কিছুদিন ছেলেটির ঘুমাতে যাওয়ার ‘কিমানো’-র হাতা দিয়ে মেয়েটি নিজের হাতটাকে জড়িয়ে রাখল। ওভাবেই ছেলেটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে থাকল মেয়েটি। তবু ঠিক আগের মতই ঘুম মেয়েটির আঙ্গুল থেকে সব শক্তি কেড়ে নিল।

“ঠিক আছে। তবে সেই পুরনো প্রবাদের মত আমি না হয় তোমাকে নারীর মাথার চুল দিয়েই বেঁধে রাখব। সে ফাঁস এড়িয়ে কোথাও তো যেতে পারবে না তুমি।” এ কথা বলে মেয়েটি নিজের কুচকুচে কালো লম্বা একটা চুল ছেলেটির গলায় পেঁচিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

যাহোক, সেদিন ভোরবেলা ঘুম ভেঙ্গে মেয়েটির কথা শুনে ছেলেটি হেসে উঠল।

“কী সব বলছ, তোমার চুল আরও লম্বা হয়ে গেছে? আসলে এমন জট পেকেছে যে তুমি তো কোন চিরুনি দিয়েই ওই চুল কোনভাবে আর আঁচড়াতে পারবে না।”

বছরগুলো যত যেতে থাকল, ওরা এইসব গল্প ভুলে গেল। আজকাল রাতে মেয়েটি যখন ঘুমাতে যায়, এমন কি ও ভুলে পর্যন্ত যায় যে ছেলেটি ওর ঠিক পাশেই শুয়ে
আছে। তবু যদি কখনও ঘুম ভেঙ্গে মাঝরাতে মেয়েটি জেগে ওঠে, সব সময়ই ওর হাত ছেলেটিকে ছুঁয়ে থাকে। আর ছেলেটির হাতও থাকে মেয়েটিকেই ছুঁয়ে। যখন ওরা আর এইসব নিয়ে আর একটুও ভাবল না, ঠিক তখন এমনভাবে একসাথে ঘুমানোটা ওদের ঘুমের অভ্যাস হ’য়ে গেল।

(লেন ডানলপের ইংরেজী অনুবাদ থেকে)


৩টি মন্তব্য:

  1. হীরক-কুচির মতো, স্বর্ণরেণুর মতো, গুঁড়ো গুঁড়ো চিকচিক করা বৃষ্টির মতো। আয়নার মতো, ভয়ের মতো, নিমফলের গায়ে-থাকা সবুজ আলোর মতো- আরো যে কত কিছুর মতো কাওয়াবাতার এই গল্পগুলো!

    উত্তরমুছুন
  2. “আমি ঘুমাতে চাই না। আমাদের কেন ঘুমাতে হ’বে? যদিও আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা, তবু সবকিছু বাদ দিয়ে শেষ পর্যন্ত কি না ঘুমাতে হ’বে আমাদের!”

    “সে কথা সত্যি নয়। প্রথমদিকে আমরাও তো ঘুমাতাম না, মনে নেই? ঘুমের মত স্বার্থপর আর কিছুই হয় না।”

    যখন ওরা আর এইসব নিয়ে আর একটুও ভাবল না, ঠিক তখন এমনভাবে একসাথে ঘুমানোটা ওদের ঘুমের অভ্যাস হ’য়ে গেল।

    পুরোটা মিলে দারুণ তো!

    - শামান সাত্ত্বিক

    উত্তরমুছুন
  3. রায়হান রাইন এর সাথে এক মত - কল্যানীর লেখার অতি সুন্দর বর্ণনা তাই আর আলাদা কিছু লিখলাম না ... কিন্তু তুই এ কি করেছিস .. আমাযে় তো মাথাযে় তুলেছিস .. আনন্দে নাচছি ... তোর থেকেই আমার কাওযা়বাতা পরিচয় .. তার কঠিন ঠান্ডা শব্দ গুলি কিভাবে যেন সারা শরীর এবং মন কে কাচের মত স্বচ্ছ করে তোলে - জীবনের আলো অনাযে়সে ঢুকে পরে এবং ঠিকরে বের হযে় রং ধনুর সাত রং নিযে়

    উত্তরমুছুন