শুক্রবার, ২২ জুলাই, ২০১১

ক্যানারি পাখি

মূলঃ ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা [১৯২৪]
অনুবাদঃ কল্যাণী রমা 


প্রকাশিতঃ http://www.banglamati.net/august-11/bishwa.php ]

প্রিয়তমাসু,
প্রতিজ্ঞা ভেঙে শুধু আর একবার হ’লেও তোমাকে একটা চিঠি আমার লিখতেই হ’বে।

গত বছর তুমি যে ক্যানারি পাখি দিয়েছিলে, তা আর আমি রাখতে পারব না। আসলে আমার বউ পাখিগুলোর দেখাশোনা করত, সব যত্ন করত। আমার একমাত্র কাজ ছিল খালি ওদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা – আর ওদের দেখে তোমার কথা ভাবা।
আর তুমিই তো একথা বলেছিলে, তাইনা? “দেখ, ঘরে তোমার বউ আছে, আর আমার আছে স্বামী। আমাদের মধ্যে দেখাটেখা বন্ধ করে দেওয়াই ভালো। তোমার ঘরে যদি বউটা না থাকত তাও একটা কথা ছিল! এই ক্যানারি পাখিগুলো দিচ্ছি। ওদের দেখতে দেখতে আমার কথা মনে কর। আরে আরে দেখ। পাখিগুলো একদম এক জোড় এখনকিন্তু দোকানদার একটা ছেলে আর একটা মেয়ে পাখিকে হঠাৎ এমনি ধরে খাঁচার ভিতর ঢুকিয়ে দিয়েছিল। এই জোড় বাধায় ক্যানারি পাখিগুলোর কোন হাতই ছিল না আসলেযাহোক, এই পাখিগুলোর সাথে সাথে আমাকে মনে রেখ। কি জানি হয়ত জ্যান্ত প্রাণী স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দেওয়াটা একটু অদ্ভুত। কিন্তু আমাদের স্মৃতিও তো জীবন্ত। একদিন ক্যানারি পাখিগুলো মরে যাবে। আর যখন আমাদের মাঝের স্মৃতিটুকুও মুছে যাওয়ার সময় হবে, স্মৃতি মুছে যেতে দিও।” 
এখন ক্যানারিগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে যেন ওরাও যে কোন সময়ই মারা যাবে। ওদের যে বাঁচিয়ে রেখেছিলো, সে তো মরে গেছে। আমি ছবি আঁকি। বড় গরীব আর এত অযত্ন সবকিছুতে। এমন নাজুক পাখি কিভাবে রাখব বল। সরাসরিই বলছি তোমাকে। আমার বউ পাখিগুলোর যত্ন করত। কিন্তু এখন তো ও মারা গেছে। ভাবছি বউটা মরে গেল বলে হয়ত পাখিগুলোও মারা যাবে। আচ্ছা বলতো, তবে কি আমার বউ-এর জন্যই তোমার কথা আমার মনে হত? স্মৃতিগুলো ফিরে ফিরে আসত?
ভেবেছিলাম ক্যানারিগুলোকে ছেড়ে দেব। কিন্তু বউটা মারা যাবার পর থেকে দেখছি পাখিগুলোর পাখাগুলোও হঠাৎ কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাছাড়া এই পাখিগুলো তো আকাশ চেনে না। শহরের বা বনের ভিতর পাখির জোড়াটার এমন কোন সঙ্গীও নেই যাদের সাথে ওরা উড়ে যেতে পারে। আর ওদের মধ্যে একজনকে যদি একা উড়ে যেতে হয়, তবে তো ওরা আলাদা আলাদা, একা একা মারা যাবে। অবশ্য তুমি বলেছিলে বটে যে ওই পশু পাখির দোকানে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে পাখিকে যাহোক কোন একভাবে ধরে দোকানদার নাকি খাঁচায় পুরে দিয়েছিল।

আর বলতে গেলে কি আসলে তুমি দিয়েছিলে বলে পাখিগুলোকে আবার অন্য কোন পাখিওয়ালার কাছে বেচতে চাই না তো আমি। এদিকে আমার বউ যত্ন করত বলে পাখিগুলোকে তোমার কাছেও ফিরিয়ে দিতে চাই না । তাছাড়া, ওদের নিয়ে তুমি যে খুব ঝামেলায় পড়বে সেও তো সত্যি। আবার কি জানি, হয়ত এতদিনে পাখিগুলোর কথা খুব সম্ভবতঃ তুমি ভুলেও গেছ।
আবার বলছি। পাখিগুলো এতদিন বেঁচেছিলো আমার বউ এখানে ছিল বলেইতোমার কথা মনে পড়ত ওদের দেখলে। তাই মরণেও ক্যানারিগুলো ওর পিছু পিছু যাক, সেটাই আমি চাই। আর আমার বউ যে শুধু তোমার স্মৃতিই বাঁচিয়ে রেখেছিলো, তা কিন্তু নয়। বল তো, তোমার মত এক নারীকে কিভাবে ভালোবাসতে পারলাম আমি? সেও আমার বউ আমার সাথে ছিল বলেই না? ওর জন্য জীবনের সব কষ্ট ভুলে গিয়েছিলাম। আমার জীবনের বাকি অর্ধেকটার দিকে তাকিয়েও দেখত না ও, সবসময় তা এড়িয়ে এড়িয়ে চলত। ও যদি এমনটা না করত, আমি তোমার মত এক নারীর দিকে ফিরেও তো তাকাতে পারতাম না
প্রিয়তমাসু,
বল এভাবে ভাবাটাই হয়ত ঠিক, তাই না? এই ধর এখন যদি আমি ক্যানারিগুলোকে মেরে ফেলে ওদের আমার স্ত্রীর কবরে পুঁতে দিই?

 (জে. মারটিন হলম্যান-এর ইংরেজী অনুবাদ থেকে)

৪টি মন্তব্য:

  1. দারুণ এক গল্প অনুবাদ করলেন শ্রীমতি রমা। আপনার অনুবাদের হাতও ভাল। অন্তর্দৃষ্টি খুলে দেবার মত এক সাহসী ও শক্তিশালী গল্প। কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেবো! আমার প্রণাম গ্রহণ করুন।

    "আমার জীবনের বাকি অর্ধেকটার দিকে তাকিয়েও দেখত না ও, সবসময় তা এড়িয়ে এড়িয়ে চলত। ও যদি এমনটা না করত, আমি তোমার মত এক নারীর দিকে ফিরেও তো তাকাতে পারতাম না।"

    শামান সাত্ত্বিক

    উত্তরমুছুন
  2. onek, onek dhonyobad!!!

    hya, ei golpogulo emon odvut! boro valobashi.

    'Palm-of-the-Hand Stories' boi-tay 70ta moto golpo achhe. dekhi kotogulo kora jay.

    valo thakben apnio! onek, onek.

    উত্তরমুছুন
  3. আশ্চর্য !!! এমনও গল্প লেখা যায়? কল্যাণী রমা আপনিও পারেন - এমন ঝরঝরে অনুবাদ করতে। চমৎকার। ধন্যবাদ। আপনার সাহিত্য চর্চা সবাইকে সমৃদ্ধ করুক।

    উত্তরমুছুন
  4. এই গল্পটি সত্যিই অদ্ভূত। ঠিক যেমনটা আবার মানুষেরা হয়তো ভাবে। কিন্তু বলে না। কিন্তু সততার গল্প মানুষকে খুব টানেও। মন থেকে চায় সত্যি বলতে, সত্যি শুনতে। খুব ভাল হচ্ছে। লেখার মধ্যে থাকতে পারাটা স্বাস্থ্যকর। আনন্দদায়ক। ---আলতাফ হোসেন।

    উত্তরমুছুন