সোমবার, ২৪ মার্চ, ২০১৪

অমরত্ব

মূল: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা [১৯৬৩]
অনুবাদ: কল্যাণী রমা


[প্রকাশিতঃ http://www.sahityacafe.com/?p=252 ]

এক বৃদ্ধ আর এক তরুণী হেঁটে যাচ্ছিল।

পাশাপাশি ওদেরকে বেশ অদ্ভুত লাগছিল। প্রেমিক প্রেমিকার মতো একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চলেছিল দু’জন, অথচ মাঝে যে ষাট বছরের বয়সের তফাৎ তা যেন অনুভবই করতে পারছিল না। বৃদ্ধ মানুষটি কানে শুনতে পেত না। তাই মেয়েটি যা বলছিল তার বেশির ভাগই বুঝছিল না সে। খয়েরি-লাল রঙের ‘হাকামা’ পরেছিল মেয়েটি। ‘কিমানো’-র রঙটা ছিল বেগুনি, শাদা। খুব সূক্ষ্ম তীর তীর মত নকশা আঁকা তাতে। ‘কিমানো’-র হাতাগুলো যেন একটু বেশিরকম লম্বা। মেয়েরা ধানের ক্ষেতে আগাছা টেনে তুলবার সময় যে রকম পোশাক পরে, ঠিক তেমন পোশাক বৃদ্ধের। শুধু লেগিংস ছিল না। জামার আঁটসাঁটো হাতা আর গোড়ালির কাছে জড়ো হওয়া পাজামা দেখে মেয়েদের পোশাকের মতই মনে হচ্ছিল তা। বৃদ্ধের সরু কোমরে সেই পোশাক ঢলঢল করে ঝুলছিল।

ওরা লনের ঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে গেল। একটা উঁচু তারের জালের বেড়া সামনে। হেঁটে যেতে থাকলে তারের বেড়ায় যে পথ থমকে যাবে, প্রেমিক প্রেমিকাদের তা খেয়ালই হ’ল না। ওরা চলা থামাল না। বরং সোজা তারের জালের ভিতর দিয়েই এগিয়ে গেল। ঠিক যেভাবে বসন্তের বাতাস বয়ে যায়।

অতিক্রম করে চলে যাওয়ার পর তারের জালটার কথা খেয়াল হ’ল মেয়েটির। “ওহ্‌ হো!” মানুষটার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “সিন্তারো, তুমিও কি ওই জালের ভিতর দিয়েই এলে নাকি?”

বৃদ্ধ মানুষটি শুনতে পেল না। কিন্তু তারের জালটা খামচে ধরল। “ধুত্তরি, যত্তসব বেজন্মা কোথাকার,” জালটা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে উঠল ও। খুব জোরে টানাটানি করতেই মুহূর্তে ওই বিশাল জালটা মানুষটার কাছ থেকে ছিটকে সরে গেল। ঠিক তাল সামলাতে না পেরে টলমল করতে করতে জালটা আঁকড়ে ধরেই পড়ে গেল সে।

“সাবধান, সিন্তারো! কি হ’ল?” মেয়েটি দু’ হাত দিয়ে মানুষটাকে জড়িয়ে ধরল। তুলে খাড়া করল ওকে।

“জালটা ছাড় তো দেখি…ইস্‌, কী ভীষণ ওজন কমে গেছে তোমার,” মেয়েটি বলে উঠল।

অবশেষে বৃদ্ধ মানুষটি উঠে দাঁড়াল। দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল, “ধন্যবাদ।”

আবার জালটা আঁকড়ে ধরল বৃদ্ধ। তবে এবার হালকাভাবে, শুধু এক হাত দিয়ে। তারপর বধির মানুষদের মতো জোরে জোরে চেঁচিয়ে বলে উঠল, “দিনের পর দিন একটা জালের পিছন থেকে আমাকে বল কুড়াতে হ’ত। দীর্ঘ সতেরো বছর ধরে তাই করেছি।”

“সতেরো বছর আর বেশি সময় কই?…অল্প কয়েকটা দিন তো।”

“যেমন খুশি বল মারত ওরা। তারের জালটার গায়ে লেগে বিচ্ছিরি শব্দ করে উঠত বলগুলো। অভ্যস্ত হওয়ার আগে আমি চমকে পিছিয়ে যেতাম। ওই বলগুলোর শব্দের জন্যই আমি আর কানে শুনতে পাই না।”

গল্‌ফ-খেলার মাঠে বল কুড়ানো ছেলেগুলোকে রক্ষা করবার জন্য ধাতুর জালটা ছিল। নিচে চাকা; ফলে সামনে, পিছনে, ডানে, বামে সরানো যেত ওই জাল। ড্রাইভিং রেঞ্জ আর তার পাশেই গল্‌ফ-খেলার মাঠটার মাঝখানে কিছু গাছ ছিল। প্রথমদিকে আসলে সেটা একটা বনের মতই ছিল, সব ধরনের গাছই ওখানে। কিন্তু গাছ কেটে কেটে এখন এই এক এলোমেলো গাছের সারিই শুধু বাকি রয়ে গেছে ।

দু’জনে হেঁটে যেতে থাকল, পিছনে পড়ে থাকল তারের জালটা।

“সমুদ্রের শব্দ কী অদ্ভুত সব আনন্দের আর সুখের স্মৃতি বয়ে আনে।” বৃদ্ধ মানুষটা যেন কথাগুলো শুনতে পায় তার জন্য মেয়েটি তার কানের কাছে মুখটা নিয়ে গেল। “আমি সমুদ্রের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।”

“কি বলছ?” মানুষটা চোখ বন্ধ করল। “আহ্‌, মিশাকো। এ তোমার সুরভিত নিঃশ্বাস। ঠিক বহু বহু দিন আগে যেমন ছিল।”

“তুমি সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাচ্ছ না? প্রিয় স্মৃতিগুলো ফিরে আসছে না?”

“সমুদ্র…তুমি কি সমুদ্রের কথা বললে? প্রিয় স্মৃতি? যে সমুদ্রে ডুবে তুমি মারা গেছ, তা কিভাবে প্রিয় স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে?”

“হ্যাঁ, আনতে পারে, ফিরিয়ে আনতে পারে তো। পঞ্চান্ন বছর পর এই প্রথম আমি আমার নিজের শহরে ফিরেছি। আর তুমিও ফিরে এসেছ। এই সব ঘটনা স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে তো ।” বুড়ো মানুষটি শুনতে পাচ্ছিল না, কিন্তু মেয়েটি বলেই চলল। “নিজে ডুবে যে মরেছিলাম, খুব ভালো হয়েছিলো তো তা। সেজন্যই তো আমি তোমার কথা সারা জীবন ধরে ভাবতে পারছি। যখন ডুবে মরছিলাম, ঠিক তখন যেভাবে ভাবছিলাম। তাছাড়া আজও আমার মাঝে যা কিছু স্মৃতি আর গল্প বেঁচে আছে, সবই তো সেই আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত। আমার কাছে তুমি চির তরুণ। আর এ কথা তো তোমার জন্যও সত্যি। আমি নিজে ডুবে যদি না মরে যেতাম আর তুমি গ্রামে এখন আমাকে দেখতে আসতে, কি দেখতে পেতে বলো তো? এক বৃদ্ধ মেয়েমানুষ। কী বিচ্ছিরি। আমি কক্ষনো চাই নি তো তুমি আমাকে সেভাবে দেখ।”

বৃদ্ধ মানুষটি কথা বলতে শুরু করল। সে কথা এক বধির মানুষের স্বগতোক্তি। “আমি টোকিও গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলাম। আর এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়ে গ্রামে ফিরে এসেছি। তা সে এক মেয়ে ছিল। জোর করে আমাদের আলাদা হয়ে যেতে হয়েছিল বলে এত কষ্ট পেয়েছিল মেয়েটি। সমুদ্রে ছুঁড়ে দিয়েছিল নিজেকে, ডুবে মরে গিয়েছিল। ওই ড্রাইভিং রেঞ্জটা থেকে সমুদ্রটা দেখা যায়। তাই আমি ওখানে একটা চাকরি খুঁজছিলাম। আমি ওদের হাতে পায়ে ধরেছিলাম আমাকে কাজটা দেওয়ার জন্য…করুণা করে হলেও যদি কিছু একটা দেয়।”

“এই যেখানে এখন হেঁটে বেড়াচ্ছি, সেই গাছে ঢাকা বনটা তোমাদের পরিবারের ছিল।”

“আমি বল কুড়িয়ে তোলা ছাড়া আর কোন কাজ করবার উপযুক্ত ছিলাম না আসলে। সারাক্ষণ নীচু হয়ে বল কুড়াতে গিয়ে আমার পিঠে চোট লাগল…কিন্তু একটা মেয়ে আমার জন্য আত্মহত্যা করেছিল। সমুদ্রের কিনারা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ওই পাথুরে পাহাড়গুলো আমার ঠিক পাশেই ছিল। তাই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হ’লেও হয়ত ইচ্ছে করলেই সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে পারতাম আমি। এমনটাই ভেবেছিলাম।”

“না, তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে। তুমিও যদি মরে যাও, আমাকে মনে রাখবার মত কেউ তো আর পৃথিবীতে থাকবে না। আমি তো পুরোপুরিই মরে যাব তখন।” মেয়েটি মানুষটাকে আঁকড়ে ধরল। বুড়ো মানুষটি শুনতে পেল না। কিন্তু সেও মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরল।

“তাই হোক। তবে চল একসাথে মরে যাই। এবার…তুমি আমার জন্য এসেছ। বল, আস নি?”

“একসাথে? কিন্তু তোমাকে যে বেঁচে থাকতে হবে। আমার জন্য বেঁচে থাক, সিন্তারো।” কথা বলতে গিয়ে মেয়েটির নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে এল। মানুষটির কাঁধের উপর দিয়ে তাকাল ও। “ওহ্‌, ওই বড় গাছগুলো এখনও ওখানে আছে দেখছি। তিনটা গাছই…সেই কবেকার কথা।” মেয়েটা আঙ্গুল দিয়ে দেখাল। বুড়ো মানুষটিও গাছগুলোর দিকে চোখ ফিরাল।

“গল্‌ফ খেলোয়াড়রা গাছগুলোকে নিয়ে সব সময় সন্ত্রস্ত। ওগুলোকে কেটে ফেলবার জন্য কতবার যে আমাদের বলেছে । ওরা যখন বল মারে, বল নাকি ডানদিকে বেঁকে যায়, যেন গাছগুলোর জাদু টেনে নেয় সেই বল।”

“যথাসময়ে মারা যাবে ওই গল্‌ফ খেলোয়াড়গুলো—গাছগুলোর অনেক আগেই। কয়েকশ’ বছর তো এমনিতেই হয়ে গেছে গাছগুলোর বয়স। ওরা ওভাবে কথা বলে, কিন্তু মানুষের জীবন যে কয়দিনের তা বোঝে না,” মেয়েটি বলে উঠল।

“আমার পূর্বপুরুষেরা কয়েকশ’ বছর ধরে ওই গাছগুলোর দেখাশোনা করেছে। তাই যখন ওর কাছে এই জমিটা বেচেছিলাম, প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলাম আমি। কোনদিন গাছগুলো কাটা যাবে না।”
“চল যাই।” মেয়েটি বৃদ্ধর হাত ধরে টান দিল। বিশাল গাছগুলোর দিকে ওরা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে শুরু করল।

মেয়েটি গাছের শরীরের ভিতর দিয়ে খুব সহজেই চলে গেল। বৃদ্ধ মানুষটিও তাই করল।
“এ কী?” মেয়েটি মানুষটির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। “তুমিও কি মারা গেছ, সিন্তারো? তুমিও কি? কখন মারা গেলে তুমি?”
কোন উত্তর দিল না বৃদ্ধ।

“তুমি আসলেই মারা গেছ…তাই না? কি আশ্চর্য যে তোমার সাথে মৃতের পৃথিবীতে দেখা হ’ল না। ঠিক আছে, আর একবার গাছের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাও তো দেখি। দেখা যাক তুমি বেঁচে আছ নাকি মরে গেছ। যদি মরে গিয়ে থাক, তবে আমরা গাছের মধ্যে গিয়েই এখন থেকে থাকতে পারব।”

ওরা দু’জন গাছের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল। আর কোনদিন সেই বৃদ্ধ মানুষটি কিংবা তরুণী মেয়েটি ফিরে এল না।

সন্ধ্যার রঙ বড় বড় গাছগুলোর পিছনে চারাগাছগুলোর দিকে ভেসে গেল। আর যেখানে সমুদ্র গর্জন করছিল, সেখানে দূরের আকাশ অস্পষ্ট লাল হয়ে উঠল।

(জে. মারটিন হলম্যান-এর ইংরেজী অনুবাদ থেকে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন